উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত নতুন জাত ‘ব্রি ধান-১১৯’ সম্প্রতি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৬তম সভায় রোপা আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। ব্রি’র প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মো: আল আমিন মঙ্গলবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দেশের উপকূলীয় লবণাক্ততাপ্রবণ অঞ্চল ও প্রতিকূল পরিবেশে চাষাবাদের উপযোগী এই ধান আবাদে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
ব্রি’র উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই নতুন জাতটি উদ্ভাবন করেছেন। লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট (এলএসটিডি) প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাসিনা খাতুন, সিনিয়র প্ল্যান্ট ব্রিডার নুসরাত জাহান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরমিন আক্তার সেতু এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিবেত ফারজানা দিশা।
উদ্ভাবিত এই জাতটির জীবনকাল প্রায় ১১৫ দিন এবং উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.৭ টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। পরিবেশ ও লবণাক্ততার তারতম্য ভেদে এর ফলন ৪.৮ থেকে ৭.৬ টন পর্যন্ত হতে পারে যা প্রচলিত ‘ব্রি ধান-৭৩’-এর তুলনায় হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি। এই জাতের গাছগুলোর গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার এবং কাণ্ড শক্ত হওয়ায় এগুলো সহজে হেলে পড়ে না।
ব্রি’র মহাপরিচালক মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রি ধান-১১৯’ জাতটির উদ্ভাবন দেশের কৃষি গবেষণাক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। এটি উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের ধান উৎপাদনে সহায়তা জোগানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে। প্রধান গবেষক মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান জানান, কৃষকদের মাঠে এই জাতের সুফল পৌঁছে যাওয়াটাই তাদের কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কক্সবাজার ও সাতক্ষীরার লবণাক্ত অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক মাঠপরীক্ষার মাধ্যমে জাতটির উপযোগিতা যাচাই করা হয়েছে। চারা অবস্থায় একটানা তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ১২ ডেসিসিমেন্স/মিটার এবং সংবেদনশীল বিভিন্ন ধাপে ৮ থেকে ১০ ডেসিসিমেন্স/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে এর। লবণাক্ত উপকূল ছাড়াও অলবণাক্ত অঞ্চলেও এটি চাষ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
স্বল্প জীবনকালের কারণে এই জাতটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রচলিত শস্যবিন্যাসে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। রোপা আমন কাটার পর মধ্যম উঁচু থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবণসহিষ্ণু সরিষা চাষের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। এছাড়া বোরো ধান কাটার পর জমিতে সবুজ সার হিসেবে ধইঞ্চা চাষের সম্ভাবনা রয়েছে যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
বোরো মৌসুমেও জাতটির চাষোপযোগিতা যাচাই করা হয়েছে এবং বীজ প্রত্যয়ন অ্যাজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ২০টি স্থানে ফলন মূল্যায়ন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় বীজ বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেই এটি চাষ করা যাবে। এতে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসলের নিবিড়তা ও শস্যবিন্যাসের বৈচিত্র্য বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
রোপা আমন মৌসুমে এই ধান চাষের জন্য ১ থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বীজ বপনের নির্দেশনা রয়েছে। ২৫-৩০ দিন বয়সী চারা প্রতি গোছায় দুই থেকে তিনটি করে সারি ও গোছার নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে রোপণ করতে হবে। হেক্টরপ্রতি প্রস্তাবিত সারের মধ্যে ইউরিয়া ২৩৪ কেজি, টিএসপি ৮৭ কেজি, এমওপি ১১৭ কেজি, জিপসাম ৭৮ কেজি এবং জিংক সালফেট ১২ কেজি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এই ধানের প্রতিটি শীষে প্রায় ২১৫টি পুষ্ট ধান পাওয়া যায় যা ব্রি ধান ৭৩-এর তুলনায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি এবং শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে যায় না। এর চাল মাঝারি চিকন ও সাদা রঙের হয়ে থাকে এবং রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয়। জাতটির বীজ উৎপাদনের দায়িত্বে রয়েছে ব্রি’র কৌলিক সম্পদ ও বীজ বিভাগ, গাজীপুর।