উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
জাতীয় ডেস্ক: সন্তানের ভালো ফলাফলের পুরস্কার কিংবা যোগাযোগের সুবিধার কথা ভেবে অভিভাবকরা অনেক সময় কম বয়সেই তাদের হাতে দামি স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু এই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে অনেক পরিবারে নেমে আসছে মারাত্মক বিপর্যয়। রাজধানীর লালমাটিয়ার এক অভিভাবক জানান, মোবাইলের প্রতি তীব্র আসক্তির কারণে মেয়ের পড়াশোনার ক্ষতি তো হয়েছেই, পাশাপাশি তার মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, একাকিত্ব ও মানসিক অবসাদের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের এই অনলাইন আসক্তি কেবল তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে না, বরং তাদের নানা ধরনের মারাত্মক সাইবার অপরাধ ও নিরাপত্তার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রঙিন দুনিয়ায় জড়িয়ে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা প্রায়শই অচেনা মানুষের প্রতারণার শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি লোমহর্ষক অপরাধের পেছনে অনলাইন যোগাযোগের যোগসূত্র পাওয়া গেছে, যা অভিভাবক সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা ইমোতে প্রেমের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই শিশু ও তরুণী। ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, অনলাইনে গ্রুমিং, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে, যা তাদের সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকিতে ফেলছে।
শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময়ের পরিমাণও বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছে, যার একটি বড় অংশই প্রস্তাবিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। অতিরিক্ত এই স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থূলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এদিকে ইউনিসেফের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশু অনলাইন দুনিয়ায় নানা ধরনের শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যার একটি বড় অংশই ভয়ে বা লজ্জায় বিষয়টি কাউকে জানাতে পারে না। এমনকি বাংলাদেশেও অনলাইন বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানির শিকার হওয়ার নানা তথ্য বিভিন্ন পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিশু নিখোঁজ ও অপরাধের গ্রাফও ঊর্ধ্বমুখী, যা ডিজিটাল আসক্তি ও সুরক্ষার অভাবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের হাতে হঠাৎ করে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে তাদের সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এর পরিবর্তে প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার শেখানো এবং অনলাইন বন্ধুত্বের সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে যৌথভাবে এমন একটি উন্মুক্ত ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সন্তানরা কোনো বিপদে পড়লে দ্বিধাহীনভাবে তা মা-বাবাকে জানাতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনেরাও পারিবারিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের মতে, অভিভাবকদের শুধু ফোন কিনে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়, বরং সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের নজরদারিতে রাখতে হবে। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিনিধি সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানী মনে করেন, শিশুদের অপরিণত বয়সের আবেগ ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই তাদের ফাঁদে ফেলে। তাই পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রকে সাইবার অপরাধী চক্রগুলো চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমাদের শিশুরা নিরাপদ থাকতে পারে।